নীতিগত উন্নয়ন ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়: কেন সুশাসনই টেকসই অগ্রগতির ভিত্তি

একটি দেশ শুধু অবকাঠামো, উঁচু ভবন বা জিডিপি বৃদ্ধির মাধ্যমে সত্যিকার অর্থে উন্নত হয়ে ওঠে না। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা ন্যায়, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। অর্থাৎ নীতিগত উন্নয়ন ছাড়া কোনো দেশের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
এই লেখায় আমরা দেখব কেন নীতিগত উন্নয়ন (Ethical Development) একটি রাষ্ট্রের সার্বিক অগ্রগতির মূল ভিত্তি।
১. সুশাসন ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই হয় না
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ঘটে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায় এবং বৈষম্য বাড়ে।
উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, যেসব দেশে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন শক্তিশালী—যেমন Singapore—সেসব দেশ খুব অল্প সময়েই বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। তাদের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল কঠোর নীতি, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা।
২. আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হলে সামাজিক স্থিতি নষ্ট হয়
একটি দেশে যদি আইনের প্রয়োগ সমানভাবে না হয়, তবে সেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়, যা সামাজিক অস্থিরতা ডেকে আনে।
আইনের শাসন নিশ্চিত হলে নাগরিকরা নিরাপদ বোধ করে, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারিত হয় এবং সমাজে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, নীতিনিষ্ঠ প্রশাসনই সামাজিক শান্তির পূর্বশর্ত।
৩. শিক্ষা ও নৈতিকতা: ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনের ভিত্তি
কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়, শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক মূল্যবোধের চর্চাও জরুরি। সততা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা ছাড়া কোনো জাতি প্রকৃত উন্নত হতে পারে না।
উদাহরণস্বরূপ, Japan-এ প্রাথমিক স্তর থেকেই শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ শেখানো হয়। এই নৈতিক শিক্ষাই দেশটির উন্নয়নের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
৪. বৈষম্য কমাতে নীতিগত অবস্থান অপরিহার্য
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ, যখন তার সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়। নীতিগত উন্নয়ন না থাকলে ধনী আরও ধনী হয়, আর দরিদ্র আরও পিছিয়ে পড়ে। ন্যায্য নীতি, সঠিক করব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি—এসবই নৈতিক উন্নয়নের অংশ। এগুলো ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
৫. আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মর্যাদা অর্জন
বিশ্বায়নের যুগে একটি দেশের ভাবমূর্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতিগ্রস্ত ও অস্বচ্ছ রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হয়।
অন্যদিকে নীতিনিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে আস্থা অর্জন করে এবং বহুমাত্রিক উন্নয়নের সুযোগ পায়।
উপসংহার
দেশের উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা, সেতু বা বড় বড় প্রকল্প নয়; বরং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা।
নীতিগত উন্নয়ন ছাড়া অর্থনৈতিক অগ্রগতি ক্ষণস্থায়ী ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। তাই টেকসই ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজন সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করে উন্নয়ন পরিকল্পনা।
একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার সম্পদে নয়—তার নীতিতে।

Comments